কিটো ডায়েট কি? কাদের প্রয়োজন কিটো ডায়েট

কিটো ডায়েট এই নাম টা আমরা সবাই শুনেছি। কারনে অকারণে, মজার ছলে,ইউটিউব এর গুনে,আবার আমরা ট্রলের মাধ্যমে ও তা শুনেছি। আসলে কি এই কিটো ডায়েট??


গত কয়েকদিন থেকে আমরা একটা বিষয় লক্ষ করছি।একটি বাচ্চা বডি শেমিং এর জন্য কিটো ডায়েট শুরু করে পরবর্তীতে তা অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসাতে রুপ নেয়।অনেকে ই জানে না এই অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা কি,কেন হয়,এর লক্ষ্মণ কি,এর চিকিৎসা কি,এটা কি প্রতিরোধ সম্ভব! নাকি না।

এই নিয়েই আমার আজকের পোস্ট । 


অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা একটি খাওয়ার ব্যাধি যা ওজন হ্রাস দ্বারা চিহ্নিত (বা বেড়ে ওঠা বাচ্চাদের উপযুক্ত ওজন বৃদ্ধির অভাব),বয়স-উচ্চতা অনুযায়ী ওজন বজায় রাখতে অসুবিধা এবং অনেক ব্যক্তির শরীরের গঠন বিকৃত করে। 


অ্যানোরেক্সিয়াযুক্ত ব্যক্তিরা সাধারণত ক্যালোরি মেপে খাওয়া এবং তারা বিভিন্ন/নিদিষ্ট কিছু খাওয়ায় সীমাবদ্ধ থাকেন। 


অ্যানোরেক্সিয়া যে কোন বয়সের,লিংগের মানুষের হতে পারে । ইতিহাসবিদরা এবং মনস্তাত্ত্বিকরা শত শত বা হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের অ্যানোরেক্সিয়ার লক্ষণগুলি প্রদর্শন করার প্রমাণ পেয়েছেন।


যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই ব্যাধি কৈশোরে শুরু হয়,বাড়ন্ত শিশু,বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদেরও অ্যানোরেক্সিয়া হতে পারে।


গবেষণায় দেখা গেছে যে স্বাস্থ্যবান ব্যক্তিদেরও অ্যানোরেক্সিয়া হতে পারে, যদিও তারা চর্বি এবং স্থূলতার জন্য সাংস্কৃতিক কুসংস্কারের কারণে নির্ণয় কম হতে পারে।


সতর্কীকরণের চিহ্ন এবং অ্যানোরেক্সিয়া নেরোভাসার লক্ষণসমূহ


১।সংবেদনশীল এবং আচরণগত পরিবর্তন 


২।খুব দ্রুত ওজন কমিয়ে ফেলার চেষ্টা। 


৩।ওজন, খাবার, ক্যালোরি, ফ্যাট,কার্বস  ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ব্যাস্ত থাকা।


৪। নির্দিষ্ট কিছু খাবার খেতে না চাওয়া,কার্ব হাইড্রেট জাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দেয়া।


৫।ওজন হ্রাস সত্ত্বেও তাদের মানসিক শান্তি না আসা, যে ওজন মনে হয় কমে নি। 


৬।ক্ষুধার্ত বোধ করলেও কিছু না খেয়ে থাকা। 


৭। নির্দিষ্ট ক্রমে খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত চিবানো।


৮।নিয়মিতভাবে খাবারের সময় বা খাবারের সাথে জড়িত পরিস্থিতি এড়াতে অজুহাত দেয়া


৯।ক্যালোরিগুলিকে "বার্ন অফ" করার প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ করা


১০।আবহাওয়া, ক্লান্তি, অসুস্থতা বা আঘাত থাকা সত্ত্বেও কঠোর ব্যায়াম করা।


১১।সাধারণ বন্ধুদের সাথে না মেশা,বাসার বাহিরে বেরোতে না যাওয়া।


১২।জনসমক্ষে বা মানুষের সামনে খাওয়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন মনে হওয়া।


১২।সামাজিক স্বতঃস্ফূর্ততা সীমিতকরন


১৩।রক্তাল্পতা, কম থাইরয়েড এবং হরমোন স্তরের তারতম্য, কম পটাসিয়াম, কম রক্ত ​​কণিকার গণনা, ধীর হার্ট বীট,মাথা ঘোর,সারাক্ষণ ঠান্ডা লাগা,ঘুমের সমস্যা, অনিয়মিত পিরিয়ড 


অ্যানোরেক্সিয়ার চিকিত্সা কী?

ব্যক্তিটিকে একটি স্বাস্থ্যকর ওজনে ফিরিয়ে আনা।বিকৃত চিন্তার ধরণগুলি সংশোধন করা এবং দীর্ঘমেয়াদী আচরণগত পরিবর্তনগুলি বিকাশের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলির চিকিত্সা করা। চিকিত্সা প্রায়শই নিম্নলিখিত চিকিত্সা পদ্ধতির সংমিশ্রণ জড়িত:


১।সাইকোথেরাপি: এটি একধরণের স্বতন্ত্র পরামর্শ যা খাওয়ার ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির চিন্তাভাবনা (জ্ঞানীয় থেরাপি) এবং আচরণের (আচরণগত থেরাপি) পরিবর্তন করতে সাহায্য  করে। কেউ তাকে খারাপ কথা বা খোটা দিলে তা থেকে কিভাবে নিজেকে ওভারকাম করাবে সে বিষয়ে তাকে শেখানো হয়।


২।ওষুধ: খাবার সম্পর্কিত উদ্বেগ এবং হতাশাকে নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে কিছু নির্দিষ্ট এন্টিডিপ্রেসেন্ট ড্রাগ যেমন সিলেকটিভ সেরোটোনিন রিউপটেক ইনহিবিটারস (এসএসআরআই) ব্যবহার করা যেতে পারে। কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টস ঘুম ও ক্ষুধা জাগাতে সাহায্য করে।নিজের শরীরের প্রতি উদ্বেগ বা বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।


৩।পুষ্টির পরামর্শ: এই কৌশলটি খাদ্য ও ওজন সম্পর্কে স্বাস্থ্যকর পদ্ধতির শিক্ষা দেওয়ার জন্য, সাধারণ খাদ্যের নিদর্শন পুনরুদ্ধার করতে সহায়তা করার জন্য এবং পুষ্টির গুরুত্ব শেখাতে এবং সুষম ডায়েট অনুসরণ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।


৪।গ্রুপ বা পারিবারিক থেরাপি: চিকিত্সা সাফল্যের জন্য পারিবারিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।পরিবারের সদস্যরা যদি খাওয়ার ব্যাধিটি বোঝে এবং এর লক্ষণ ও লক্ষণগুলি সনাক্ত করতে পারে তা গুরুত্বপূর্ণ। খাওয়ার ব্যাধিজনিত ব্যক্তিরা গ্রুপ থেরাপি থেকে উপকৃত হতে পারেন, যেখানে তারা সমর্থন পেতে পারেন এবং অন্যদের সাথে সাধারণভাবে নিজের অনুভূতি এবং উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারেন। 


৫।হাসপাতালে ভর্তি:অত্যাধিক ডায়েটের ফলে অনেক ওজন হ্রাস হওয়ার জন্য  হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হতে পারে যা অপুষ্টি এবং অন্যান্য গুরুতর মানসিক বা শারীরিক স্বাস্থ্যের জটিলতায় যেমন হার্টের ব্যাধি, গুরুতর হতাশা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে, রোগীকে টিউব বা আইভিয়ের মাধ্যমে খাওয়ানো যেতে পারে।


অ্যানোরেক্সিয়া প্রতিরোধ করা যায়?

যদিও অ্যানোরেক্সিয়ার পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব না হলেও,লক্ষণগুলি শুরু হওয়ার সাথে সাথেই চিকিত্সা শুরু করা আবশ্যক ।


এছাড়াও, স্বাস্থ্যকর খাওয়ার অভ্যাস,খাদ্য এবং দৈহিক গঠন সম্পর্কে বাস্তববাদী শিক্ষা দেওয়া এবং উত্সাহিত করা, অ্যানোরেক্সিয়া  প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।



সর্বশেষ একটা কথাই বলবো। কিটো ডায়েট চার্ট নির্ভর করে আপনার শারিরিক গঠন, ওজন, উচ্চতা এসবের উপর। তাই কোন রেজিস্ট্রার ডাক্তার বা নিঊট্রিশনিষ্ট এর পরামর্শ ছাড়া ইউটিউব এর তত্বাবধানে এসব ডায়েটে নিজেকে জড়াবেন না।


ডাঃ শাহাদাত আলম কাব্য

ইন্টার্ন ডাক্তার

২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল,নোয়াখালী 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচ্চ রক্তচাপ কি। হাই ব্লাড প্রেশার কি। বা প্রেশার কি? কেনো হয়?